ওয়াদি-আল-জ্বিন – রহস্যময় জ্বিনের পাহাড়

জ্বিন-ভূত নিয়ে আমাদের কৌতূহল চিরন্তন। কারও কারও কাছে এটি কেবলই কুসংস্কার, অন্যদিকে অনেকেই আবার জ্বিন বা ভূতের অস্তিত্বকে বিশ্বাস করেন সন্দেহতীতভাবে। সময়ের সাথে জ্বিন বা ভূতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা গল্প এবং উপকথা। এসব গল্প-উপকথা পৃথিবীর অনেকগুলি স্থানকে পরিচিত করে তুলেছে আমাদের কাছে। যার মধ্যে অন্যতম হিসেবে বলা যেতে পারে হাইয়া বাছিউ (Hoia Baciu), বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল (Bermuda Triangle) সহ আরো অনেক স্থানের নাম।

আজ আমরা এমন একটি স্থান সম্পর্কে আলোচনা করব, যার নামকরণই করা হয়েছে জ্বিনের নামে।

ওয়াদি-আল-জ্বিন

পবিত্র ভূমি মদিনায় ওয়াদি আল বাদিয়া নামক একটি স্থান আছে যা তার আসল নাম থেকে বেশি পরিচিত ওয়াদি-আল-জ্বিন নামে। এটিই জ্বিনের পাহাড় বা জ্বিনের উপত্যকা হিসেবে দেশ-বিদেশে নানা স্থানে পরিচিত হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক আসেন ওয়াদি-আল-জ্বিনের রহস্যময় কার্যালাপ প্রতক্ষ্য করতে।

ওয়াদি-আল-জ্বিনের অবস্থান লোকালয় বা ছোট গ্রাম থেকে অনেক দূরে। আশেপাশে কোন বসতি প্রায় চোখে পড়ে না বললেই চলে। ওয়াদি-আল-জ্বিনের কাছাকাছি থাকা বাসিন্দাদের মতে অনেকেই ওয়াদি-আল-জ্বিন উপত্যকায় বসতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জ্বিনদের উৎপাতের কারনে সেটি সম্ভব হয় নি। তাদের ভাষ্যমতে রাত হলেই উপত্যকা থেকে আওয়াজ আসতে থাকে –

”এটি আমাদের জায়গা, এখান থেকে চলে যাও।”

এছাড়াও আরো কিছু লোককথা এ স্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে যেমন নবী মুহম্মদ (স) এখানে জ্বিনদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সে সময় এ উপত্যকায় থাকা বেশিরভাগ ‍জ্বিন সে দাওয়াত গ্রহণ করলেও কিছু দুষ্টু জ্বিন দল ছেড়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। তাদের পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে গোত্র প্রধান জ্বিনেরা এখানকার পথ উল্টে দেয়। ফলে এখানে সবকিছু উল্টোদিকে চলে। যদিও এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট কোন প্রমান নেই কাজেই বেশিরভাগ মানুষই এটিকে কেবল লোককথা বলে মনে করেন।

ওয়াদি-আল-জ্বিন এর রাস্তা – image source: Trip Adviser

আজও পর্যন্ত ওয়াদি-আল-জ্বিন জনবসতিহীন অবস্থায় থেকে গিয়েছে। তবে জ্বিনের রহস্যময় কার্যালাপ দেখার জন্য আপনাকে যে কেবল রাতেই সেখানে হাজির হতে হবে এমনটি নয়। দিন বা রাতে যেকোন সময় সেখানে গেলে যে জিনিসটি সবার প্রথমে আপনাকে অবাক করে দিবে সেটি হলো মাধ্যাকর্ষণ। এতোদিন স্কুলে কলেজে  বিজ্ঞান বইতে মাধ্যাকর্ষণ নিয়ে যা পড়েছেন তা ভুল প্রমান করে দেখা যাবে বস্তু এখানে নিচের দিকে না নেমে বরং উল্টো পাহাড় বেয়ে ওঠা শুরু করেছে, তাও আবার নিজ থেকে।

পাহাড়ের দিকে গড়িয়ে চলা পানির বোতল – image source: youtube.com

আপনি যদি ওয়াদি-আল-জ্বিনের রাস্তায় পানি ঢেলে দেন তবে দেখা যাবে পানি গড়িয়ে পাহাড়ী রাস্তার নিচের দিকে না যেয়ে বরং পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠা শুরু করেছে। এটি যে কেবল পানির ক্ষেত্রে ঘটে থাকে এমনটি নয়। বরং রাস্তায় ইন্জিন বন্ধ করে দাড়িয়ে থাকা গাড়িগুলিও চালকবিহীন অবস্থায় সম্পূর্ণ নিজ থেকে পাহাড়ের দিকে উঠে যেতে থাকে। পাহাড় বেয়ে ওঠার সময় ধীরে ধীরে গাড়িগুলোর গতি বাড়তে থাকে। এমনকি ১০০ কিলোমিটার গতিতে ইন্জিন বন্ধ অবস্থায় পাহাড়ের উপরে ওঠার রেকর্ড রয়েছে ওয়াদি-আল-জ্বিন উপত্যকায়।

বৃষ্টিহীন শুষ্ক এ মরুউপত্যকায় একটি লেক আছে যেটি সারা বছর শুকনা থাকলেও বছরের কিছু সময় বৃষ্টির পানিতে ভরে ওঠে। লেকের পানির ক্ষেত্রে মাধ্যাকর্ষনের নিয়মবহির্ভূত আচরণ লক্ষ্য করা যায়। পাহাড় বেয়ে পানি নেমে আসার বদলে তা প্রবল বেগে পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠতে থাকে।

ভরা মৌসুমে ওয়াদি-আল-জ্বিনের লেক – image source: YouTube

সর্বশেষ ২০১০ সালে সৌদী সরকার এ উপত্যকার ওপর দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটারের রাস্তা তৈরির একটি প্রকল্প নিয়েছিল। এ উপত্যকার কাছে পৌঁছানোর পর রাস্তার কাজে ব্যবহৃত রোলারগুলি থেকে শুরু করে নির্মানের যন্ত্রপাতিগুলি মাটিতে ঘেঁষতে ঘেঁষতে পাহাড় বেয়ে মদীনার দিকে চলে যেতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে রাস্তার শ্রমিকেরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ২০০ কি. মি. রাস্তার কাজ ৪০ কি. মি. পর্যন্ত হবার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। পর্যটকগণ মূলত এই ৪০ কি. মি. যাবার পর ঘুরাঘুরি শেষে আবার মদীনায় ফেরত চলে যান।

রহস্যময় আচরণের ব্যাখ্যা

পৃথিবীতে সব সময়ই কিছু মানুষ থাকেন যারা কোন ব্যাখ্যাতীত ঘটনাকে কেবল রহস্য হিসেবে ধরে নিয়ে বসে থাকতে নারাজ। ফলে নেমে পড়েন রহস্যময় ঘটনার পেছনে থাকা কারণকে সকলের সামনে তুলে আনতে। তেমনি কৌতুহলি মানুষজন ওয়াদি-আল-জ্বিনের রহস্য ভেদ করতে নানা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। প্রথম দিকের অনুসন্ধান থেকে এ উপত্যকার এমন মাধ্যাকর্ষণ বিরোধী কারণ হিসেবে চুম্বকায়িত পাহাড়কে দায়ী করা হয়। তাদের মতে ওয়াদি-আল-জ্বিন এর পাহাড়গুলি কোন কারণে শক্তিশালীভাবে চুম্বকায়িত হয়ে আছে। শক্তিশালী চুম্বকের আকর্ষণের প্রভাবে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলি নিজ থেকেই পাহাড়ের দিকে ছুটে আসতে থাকে।

ধারণা করা হয় পাহাড়গুলির চুম্বক শক্তির প্রভাবে সবকিছুকে উপরের দিকে টেনে আনে – image source: YouTube

তবে অন্য একদল অনুসন্ধানকারী এ চুম্বক তত্বকে বাতিল ঘোষণা করেন। তাদের মতে পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠার ঘটনা পাহাড়গুলির চুম্বকত্বের প্রভাবে হলে কেবল গাড়ি বা ধাতব পদার্থই চুম্বকের প্রভাবে আকর্ষিত হয়ে উপরে উঠে আসত। কিন্তু ওয়াদি-আল-জ্বিনে যে কেবল ধাতব পদার্থ পাহাড়ের দিকে নিজ থেকে বেয়ে ওঠে এমনটি নয়। বরং পানি, প্লাস্টিকের বোতল এমনকি রাস্তার পরে খুলে রাখা জুতাও নিজ থেকে পাহাড়ের উপর দিকে যেতে থাকে। ফলে পাহাড়ের চুম্বকত্বের জন্য এমনটা হলে তা কেবল ধাতব পদার্থের ওপর কাজ করত। একারণে ওয়াদি-আল-জ্বিনের রহস্যময় ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে চুম্বকতত্ব বাতিল করে দেওয়া হয়।

তাহলে কি হতে পারে এমন রহস্যময় আচরণের কারণ?

এ রহস্যময় আচরণের কারণ খুঁজে পেতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গবেষক ওয়াদি-আল-জ্বিন উপত্যকায় সফর করেছেন। তার মধ্যে আছেন পদার্থবিদ থেকে শুরু করে স্বনামধন্য ভৌগলিক পর্যন্ত। বিস্তর গবেষনা এবং অনুসন্ধানের পর তারা অবশেষে জ্বিন পাহাড়ের রহস্য ভেদ করতে সক্ষম হন।

শুনতে অবিশাস্য মনে হলেও ওয়াদি-আল-জ্বিনের ঘটনটি ঘটছে সম্পূর্ণ আমাদের মস্তিস্কে। অর্থাৎ গাড়ি থেকে শুরু করে সবকিছু আসলে এখানে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছে না বরং ঢালু রাস্তা বেয়ে নিচের দিকেই নামছে। কিন্তু আমাদের কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হবার কারণ হলো দৃষ্টিভ্রম

ওয়াদি-আল-জ্বিনের চারপাশের প্রকৃতি এবং উপত্যকার রাস্তাটি এমন অবস্থানে রয়েছে যেখানে রাস্তার উপরের দিকটা মনে হয় নিচে নেমে গিয়েছে আর নিচের দিকটা মনে হয় উপরে উঠে গিয়েছে। বিভিন্ন ত্রি-মাত্রিক ছবিতে আমরা এ ঘটনাটি দেখতে পারি যেখানে টেবিলে রাখা ছবি একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় তার দৈর্ঘ প্রস্থ উচ্চতা আছে। কিন্তু নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে সরে গেলেই ছবিটি ত্রি-মাত্রিক আকৃতি বদলে সাধারণ ছবি হয়ে ওঠে। উধাহরণ হিসেবে আমরা নিচের ছবিটি দেখতে পারি।

দৃষ্টিভ্রমের কারণে মনে হচ্ছে কাগজটিতে যেন ঢেউ খেলে যাচ্ছে – image source: YouTube

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন অংশে এমন রহস্যময় পাহাড়ের উপস্থিতি পাওয়া যায় যেগুলো গ্রাভিটি হিল (Gravity Hill) নামে পরিচিত। উইকিপিডিয়াতে গ্রাভিটি হিল নামে সার্চ করে দেখে নিতে পারেন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টিকারী পাহাড়ের তালিকাটি। বিশ্বের মোট ৩৫ টি দেশে প্রায় ১০০টিরও বেশি এমন দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টিকারী পাহাড় রয়েছে। যার মধ্যে আমেরিকাতেই আছে এমন ৪০টি পাহাড়। তবে গ্রাভিটি হিলের রোমাঞ্চের স্বাদ পেতে চাইলে পাশের দেশ ভারত থেকেই ঘুরে আসতে পারেন। ভারতের গুজরাট, লেহ, মুম্বাই এবং ছত্রিশগড়ে এমন গ্রাভিটি হিলের দেখা পেতে পারেন।

ভিডিওতে ওয়াদি-আল-জ্বিন

Video Source: Bangla media 24

This article is about Wadi e Jinn – Al Baida, the mysterious gravity or magnetic hill of Madina, Saudi Arabia.

Feature Image source: World for Travel

Share Your Reactions or Comments Below
  • Awesome (3)
  • Interesting (1)
  • Useful (0)
  • Boring (1)
  • Not Good (0)

আরো দেখুন

Leave a Comment