হিরোশিমা ও নাগাসাকি: দুই মৃত্যুর-শহরের গল্প (২য় পর্ব)

এই সিরিজের প্রথম পর্ব হিরোশিমার গল্প-১’র পর লেখারপাতা’র পাঠকদের জন্য আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব ‘হিরোশিমার গল্প-২’। লিটল বয়’র তান্ডবে তখনও হিরোশিমার আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে আছে, এখন আমরা চলে যাব ওই হামলার পরিণতি কি হয়েছিল সেদিকে…

হামলার পরিণাম

লিটল বয় বিস্ফোরিত হওয়ার সাথে সাথে ৮০,০০০ থেকে ১৪০,০০০ হাজার মানুষ সহ সকল জীবিত প্রানী পুড়ে মারা যায়! যারা কিছুটা দূরে অবস্থান করছিল তাদের অবস্থা ছিল আরো ভয়ানক, ভয়াবহ বিকিরণে কারো কারো হাত-পা বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে যায়, প্রচন্ড উত্তাপে কারো কারো চামড়া ঝলসে যায়, কারো শরীরের মাংস খুলে খুলে পড়তে থাকে। পরনের জামা পুড়ে গিয়ে চামড়ার মধ্যে বসে যায়।

বোমার ভয়াবহ বিকিরণে ঝলসে যাওয়া শরীর – image source: australiandoctor.com.au

একজন বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী তার বর্ননাতে বলেন –

“মানুষের চেহারা বোঝা যাচ্ছিলনা। শরীরের চামড়া মাংস পুড়ে কালো হয়ে এক হয়ে গিয়েছিল! কারো মাথায় কোন চুল ছিলনা, আগুনের তাপে পুড়ে গিয়েছিল সব! কারো কারো হাত-পা উড়ে গিয়েছিল বা বিকৃত হয়ে বেঁকে গিয়েছিল! হঠাৎ করে দেখে বোঝা যাচ্ছিলনা যে এটা একজন মানুষের সামনের দিক না পিছনের দিক! একজন দুইজন না, আমি যেদিকেই হেটেছি সেদিকেই দেখেছি ভুতের মত কিছু মানুষ এদিক ওদিক হাটছে এবং রাস্তার পাশে আরো অসংখ্য মানুষ মৃত অবস্থায় পড়ে আছে!”

হিরোশিমার রাস্তায় পরে থাকা বিস্ফোরনের আগুনে আহত ও মৃত মানুষ – image source: theconversation.com

বিস্ফোরনের ভয়াবহ তেজষ্ক্রিয়তায় আরো ১০০,০০০ মানুষ পঙ্গু হয়ে পড়ে যাদের অধিকাংশই পরবর্তীতে রোগসমূহে ভুগে মারা যায়। তেজষ্ক্রিয়তার ধারাবাহিকতায় হিরোশিমাতে পরবর্তি বেশ কয়েক বছর বিকৃত শিশু জন্ম নেয়! হিরোশিমা শহরের দুই-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। তিন কিলোমিটার এর মধ্যে থাকা ৬০,০০০ থেকে ৯০,০০০ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গোটা এলাকা ধ্বংস্তুপে এ পরিনত হয়।

সমস্ত ঘরবাড়ী রাস্তায় উলটে পড়েছিল, রাস্তায় থাকা গাড়িগুলো দূমড়ে-মুচড়ে একাকার! স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মঠ ভেঙ্গে গুড়িয়ে গিয়েছিল। গাছ গুলো মনে হচ্ছিল কেউ টেনে টেনে উপড়ে ফেলে রেখেছে। ভবনগুলোর ছাদের টাইলস সহ ব্যাবহৃত অন্যান্য ধাতু আর পাথর সমূহ বিকৃতভাবে গলে গিয়েছিল! বিস্ফোরনের প্রায় ৩০মিনিট পরে শহরের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে ‘কালো বৃষ্টি’ শুরু হয়, এই বৃষ্টি বাতাসের সাথে মিশে থাকা ধূলিবালি, ছাই এবং উচ্চ তেজষ্ক্রিয় কণা পূর্ণ ছিল যা মানুষের গায়ে এসিডের ন্যায় পড়ছিল! একই সাথে আশেপাশের আরো অনেক অঞ্চল তেজষ্ক্রিয় কণায় দূষিত হয়ে যেতে থাকে।

ধ্বংসস্তুপে পরিনত হওয়া হিরোশিমা শহর – image source: broadsheet.ie

হিরোশিমাবাসী তখনও বুঝে উঠতে পারছিলনা ঠিক কি হয়েছে তাদের সাথে। তারা একটা ধাঁধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। জাপানিরাও ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে পরে, শত্রুরা আক্রমন করলেও হিরোশিমাতে তো কোন বিস্ফোরক গুদাম ছিলনা যার কারনে এত ভয়াবহ বিস্ফোরণ হতে পারে!

হামলার ঠিক ১৬ ঘন্টা পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুমান ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রকাশ্য ঘোষনা দেন –

“জাপানে একটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। জাপান যদি এখনো আমাদের শর্তাদি মেনে না নেয় তাহলে অচিরেই জাপানের উপরে এমন আরো অনেক বোমার বৃষ্টি নেমে আসবে যা পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কখনো কেউ দেখেনি!”

এ ঘোষনার মধ্যদিয়েই আমেরিকা হামলার দায় স্বীকার করলে জাপান তাদের সাথে ঠিক কি হইয়েছিল তা জানতে পারে। তবে মজার কথা হচ্ছে, জাপান প্রথমে পারমাণবিক বোমার কথা একেবারেই উড়িয়ে দেয়! তারা তাৎক্ষণিক ভাবে একটা ‘পারমাণবিক বোমা প্রতিব্যবস্থা কমিটি’ (Atomic Bomb Countermeasure Committee) গঠন করে। কমিটিতে সামরিক, নৌ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞ সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই কমিটি ৭ই আগস্ট তাদের প্রথম সভায় আমেরিকার হামলাটিকে পারমাণবিক বোমা নয় বলে শক্তভাবে এক বিবৃতি দেয় এবং ‘পারমাণবিক’ শব্দটির বিরোধিতা করে!

আমেরিকা যে এত দ্রুত বা সেসময়ের মধ্যেই পারমানবিক বোমা আবিষ্কার করে ফেলবে এবং সেটা প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে বয়ে নিয়ে আসবে এটা জাপান কল্পনাও করতে পারেনি। সেদিনই হিরোশিমায় পাঠানো জাপানি সেনা ও নৌবাহিনীর তদন্তকারী দল শহরটি পর্যবেক্ষণ করে ধ্বংসযজ্ঞের অবস্থা ও ধরন দেখে বুঝতে পারেন এটা প্রচলিত কোন বোমার আঘাতে এমন হতে পারেনা, পরিস্থিতি দেখে তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই পারমানবিক বোমার নিখুত আবিষ্কার ও ব্যাবহার করেছে যার থেকে জাপান তখনও অনেক পিছিয়ে।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া হিরোশিমা – image source: lobelog.com

হিরোশিমাতেই কেন?

স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তা আসতে পারে হিরোশিমাতেই কেন প্রথম পারমাণবিক বোমা হামলা চালানো হল? জাপানে তো আরো জায়গা ছিল! আসলে, হিরোশিমাকে হামলা চালানোর প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়ার মূল কারন ছিল, হামলার জন্য মার্কিন জেনারেলদের অক্ষত একটি শহরের দরকার ছিল যাতে হামলার পরে পারমানবিক বোমার শক্তির একটা ধারনা নেয়া যায় এবং পরবর্তি প্রভাব নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা যায়!

প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান কোন সামরিক এলাকায় হামলার কথা ভাবলেও কিছু পরামর্শক বিশ্বাস করেছিলেন কোন জনবহুল শহুরে এলাকায় বোমা হামলা করলে জাপান হয়ত দ্রুত আত্নসমর্পন করবে। এছাড়াও হিরোশিমা ছিল একটি বন্দর এলাকা আর সামরিক সদর দপ্তর। যেটা ছিল হামলার একটি কৌশলগত উদ্দেশ্য। একই সাথে যেহেতু হিরোশিমাতে আগে বোমা হামলা চালানো হয়নি তাই হামলার পরবর্তি ক্ষয়ক্ষতির পরিষ্কার ও প্রয়োজনমত ভিজ্যুয়াল চিত্রও নেয়া যাবে।

হিরোশিমার বর্তমান অবস্থা

পারমানবিক বোমা হামলায় প্রায় নিশ্চিহ্ন ও বোমার তেজষ্ক্রিয়তায় দূষিত হয়ে যাওয়া শহরটিতে এখন ১.১২ মিলিয়ন জনসংখ্যার সমন্বয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় একটি নগর। বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমাকে ১৯৫০ সাল থেকে আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়, হিরোশিমা এখন জাপানের অন্যতম প্রধান শিল্প নগরী হিসেবে পরিচিত। হিরোশিমার এখন প্রধান শিল্পগুলো হল, স্বয়ংক্রিয় মেশিন, মোটর কোম্পানি মাজদা এবং খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াকরন। মজার বিষয় হচ্ছে, হিরোশিমার এক-চতুর্থাংশ বিদ্যুতই আসে পারমানবিক শক্তি থেকে। কয়েকদশকের চেষ্টা এখন স্পষ্ট হয়েছে।

সাজানো গোছানো আজকের শিল্প নগরী হিরোশিমা – image source: azamara.com

আজকের আধুনিক হিরোশিমা শহরে প্রতিদিনই মানুষ স্বাভাবিক ভাবে ঘুড়ে-বেড়াচ্ছে, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, উপাসনালয়, শপিংমল আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো মানুষের কোলাহলে পরিপূর্ন! সাজানো গোছানো শহরতলীর রাস্তার পাশগুলোতে সারিবদ্ধ সব দালান আর ভবন দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি পার্ক এখন সুন্দর আর সবুজ।

হিরোশিমার যে জায়গাটির উপরে লিটল বয় পড়েছিল, সেখানে এখন ‘পিস মেমোরিয়াল পার্ক’ তৈরী করা হয়েছে যেখানে প্রতি বছরই একটি বার্ষিক শান্তির ঘোষনা পাঠ করা হয় এবং শান্তি সংস্কৃতির শহর হিসেবে পারমানবিক অস্ত্র থেকে মুক্তির একটি বিশ্বসম্মেলন নিয়মিতভাবে হয়ে আসছে। যা হিরোশিমা তথা জাপানবাসী বিশ্বাস করে এই ঘোষনা পরবর্তি প্রজন্মকে শান্তির গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করবে!

আমেরিকা কিন্তু শুধু হিরোশিমাতে হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, অকল্পনীয় এক বিস্ফোরনের তান্ডবে জাপান জ্ঞানশূন্য হয়ে পরলেও আমেরিকা কিন্তু তখন অন্যকিছুই ভাবছিল!

তৃতীয় পর্ব পড়ুন এখানে – ‘নাগাসাকি’র গল্প-১

Featured image source: mcnd.org.uk

Share Your Reactions or Comments Below
  • Awesome (2)
  • Interesting (2)
  • Useful (1)
  • Boring (0)
  • Not Good (0)

Last Updated on

আরো দেখুন

Leave a Comment