ইতিহাসের নিষ্ঠুর ও নৃশংস যত মৃত্যুদন্ড কার্যকরের পদ্ধতি

“প্রাচীন আর মধ্যযুগের বেশিরভাগ অত্যাচারী ব্যাক্তি কিংবা শাসকই বিশ্বাস করত মৃত্যু একটি সহজ স্বাভাবিক বিচার! স্বাভাবিক মৃত্যদন্ড দেয়া মানেই আসামী বা বন্দিদের মুক্তি দিয়ে দেয়া। মৃত্যুর ভিতর দিয়ে তাদের আসলে মুক্তি ঘটে, অপরাধ করেও একপ্রকার বেঁচে যায় তারা! তাই পৃথিবীতেই আসামী বা বন্দিদের নরক যন্ত্রণা দেয়ার ব্যবস্থা করা হত।”

একজন অপরাধী তার অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তি পাবে, এটাই স্বাভাবিক। হয়তো তার জেল হবে, ফাঁসি হবে। অপরাধ বেশি গুরুতর হলে তার শিরচ্ছেদও করা হতে পারে। কিন্তু একবার ভাবুনতো, একজন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীকে দুপাশ থেকে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হল! অথবা তার পেটটা চিড়ে তার ভিতরে পোকামাকড় ভরে দিয়ে আবার সেলাই করে দেয়া হল! আবার এমনও হতে পারে, অপরাধীকে একটা পানিভর্তি পাত্রে ফেলে দিয়ে গরম আগুনের উপর রেখে সিদ্ধ করে ফেলা হল, নয়তো তার শরীরটি মাঝ বরাবর করাত দিয়ে কেটে ফেলা হল!

ভাবতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ইতিহাসের একটা সময়ে এভাবেই রোম-হর্ষক নির্যাতনের মাধ্যমে অপরাধীর বা বন্দিদের মৃতুদন্ড কার্যকর করা হত। প্রাচীন ও মধ্যযুগের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের বেশিরভাগ পদ্ধতিই ছিল এমন ভয়াবহ ও অমানবিক। সে সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জনসম্মুখে অপরাধীদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা, কাঁটা ওয়ালা লোহার বাক্সে ভরে দেয়া, শরীরের চামড়া ছিলে লবণ মেখে দেয়া, হাতির পায়ের নিচে রেখে মাথা থেতলে ফেলা সহ অসংখ্য ভয়ংকর সব মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রচলিত ছিল যা জানলে এখনো বিস্মিত হতে হয়! এমনকি অষ্টাদশ শতাব্দীতেও এরকম কিছু বীভৎস মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বর্ণনা পাওয়া যায়। ইতিহাসের এমনই কিছু নিষ্ঠুর নৃশংস মৃত্যুদন্ড কার্যকরের পদ্ধতি বর্ণনা নিয়ে আজকের এই লেখা।

১৫) সিমেন্ট এর জুতা

এই পদ্ধতিটি আমেরিকান মাফিয়াদের বিশেষ পছন্দের ছিল। এটা ছিল তাদের নিজস্ব আইনানুযায়ী ভয়ংকর এক শাস্তি ব্যাবস্থা যার পরিনতি ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। শত্রুপক্ষের কাউকে শেষ করে দিতে চাইলে অথবা গুপ্তচর কেউ ধরা পড়লে তাদের কপালে নেমে আসত এই ভয়াবহ পরিনতি। মাফিয়ারা বন্দিকে ধরে তার পা দুটো বক্স এর মত চারকোনা একটা ব্লকে রেখে সেখানে গোড়ালির উপর পর্যন্ত সিমেন্ট বালু দিয়ে ভরে দিত। এরপর সিমেন্ট এর মিশ্রণ শুকিয়ে বন্দি শক্ত সিমেন্টের মধ্যে আটকে গেলে তাকে নিয়ে নদী কিংবা গভীর কোন জলাশয়ে ফেলে দেয়া হত। শক্ত সিমেন্টের কারনে দ্রুতই লোকটি পানির তলদেশে পৌছে যেত, এরপর হাত ছোড়াছূড়ি করে ছটফট করতে করতে সেখানেই তার করুণ মৃত্যু হত!

সিমেন্ট এর জুতা – image source: Learninghistory.com

১৪) হাতি দিয়ে মাথা পিষ্ট করা

একটা সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মৃত্যদন্ড কার্যকর করার জন্য হাতি নিযুক্ত করা থাকত। অপরাধীকে হাত-পা বেঁধে বিশাল আকৃতির হাতির সামনে এনে রাখা হত, তখন হাতিটি মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীর মাথা পা দিয়ে মাড়িয়ে থেতলে দিত! কিছু কিছু হাতিকে আবার প্রশিক্ষণও দেয়া হতে যাতে সে আসামীর মাথাতে আস্তে আস্তে মাড়িয়ে দেয়, এরপর ভয়, আতঙ্ক, আর যন্ত্রনায় অপরাধী চিৎকার করতে থাকলে হাতিটি তার পায়ের নিচে থাকা মাথাটি এক চাপে পিষিয়ে দিত!

হাতির পায়ের তলায় মাথা পিষ্ট করা হচ্ছে – image source: commons.wikimedia.org

১৩) ড্রাম এবং স্ক্যাফিজম

এই নির্যাতন পদ্ধতি দুটির নাম, স্থান এবং সময়কাল আলাদা হলেও নির্যাতনের ধরন ছিল প্রায় একই রকম। ড্রাম বা ব্যারেল এর প্রচলন ছিল রোম সম্রাট ডোমিশিয়ান এর শাসনামলে আর স্ক্যাফিজম (Scaphism) এর উৎপত্তি প্রাচীন পারস্যে। নানা রকম নির্যাতনের মধ্যে অন্যতম ছিল এই ধরনদুটি। অপরাধী বা বন্দি ব্যাক্তিকে একটি ড্রামের মধ্যে ভরে দিয়ে শুধু হাত-পা-মাথা বের করে রাখা হত, এরপর তাকে জোর করে খাওয়ানো হত দুধ-আর মধু। এত বেশি পরিমানে খাওয়ানো হত যে একপর্যায়ে অপরাধীর ডায়রিয়া শুরু হয়ে যেত, আর ডায়রিয়া করতে করতে ডায়রিয়ার মলদ্বারা ড্রামটি পরিপূর্ণ হয়ে যেত! ওইভাবেই তাকে ফেলে রাখা হত।

এছাড়াও শরীরের বের হয়ে থাকা অংশ গুলোতে দুধ আর মধু মাখিয়ে দেয়া হত, সেসব জায়গাগুলোতে পোকা-মাকড়ের সংক্রমন হয়ে মাংসে পচন ধরত। স্ক্যাফিজম পদ্ধতিটাও একই রকম শুধু এখানে ড্রাম এর বদলে গাছের গুড়ি অথবা দুটি কাঠের তৈরী নৌকার মাঝে আটকে রাখা হত! শরীরের নাজুক অংশগুলোতে মাখিয়ে দেয়া হত দুধ-মধু! পোকামাকড়েরা এসে শরীরের সেসব অংশ খেয়ে ফেলত। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার পরে বন্দিদের শরীরের ভিতরেও পোকামাকড় বাসা বাধত, ধীর গতিতে এভাবে প্রায় ১০-১৫ দিন তীব্র যন্ত্রনায় ভুগতে ভুগতে তাদের মৃত্যু হত!

স্ক্যাফিজম – এভাবেই নৌকার মাঝে আটকে রাখা হত – image source: Odyssey

১২) চাকার র‍্যাক

মধ্যযুগের নির্মম যত মৃত্যুদন্ডের কথা আমরা জেনেছি, র‍্যাক চাকার ব্যাবহার তাদের মধ্যে অন্যতম। চারকোনা টেবিল আকৃতির এর যন্ত্রটির মাথা ও পায়ের কাছে দুটি দন্ড চাকার সাহায্যে লাগানো থাকত, উভয় দন্ডেই থাকত দুটি করে মোট চারটি দড়ি। অপরাধীকে ধরে এনে এই টেবিলে শুইয়ে হাত পা ছড়িয়ে সেই দড়ি দিয়ে টান টান করে বেঁধে ফেলা হত, এরপর শুরু হত চাকা ঘোড়ানো! জল্লাদেরা সেই চাকা যত ঘোড়াতো, হাত পায়ের টান তত বাড়তে বাড়তে শরীর থেকে ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যেত! কখনো সখনো শরীর পেট থেকে ছিঁড়েও আলাদা হয়ে যেত!

চাকার র‍্যাক ঘুরানো হচ্ছে। image source: allthatinteresting.com

১১) টানা এরপর চার টুকরা করা (drawing and quartering)

ইতোপূর্বে আমরা দুই অথবা তিন টুকরা করার কথা শুনেছি, এবার আমরা চার টুকরা করার কথা জানব! ১৩৫২ সালে ইংল্যান্ডের উচ্চ আদালতে আসামীদের আইনীদন্ড হিসেবে এমন শাস্তির বিধান ছিল। যদিও রাজা তৃতীয় হেনরি (১২১৬-১২৭২) প্রথম এমন নির্মম রীতিটি চালু করে বলে জানা যায়। এ পদ্ধতিতে অপরাধীর চার হাত-পা চারদিকে টানটান করে ঘোড়ার সাথে বেঁধে দেয়া হত, চারটি ঘোড়ার সামনেই দাগ টেনে দেয়া হত! এরপর জল্লাদেরা নিজ নিজ ঘোড়াকে সামনের সেই দাগের দিকে ছুটে যেতে তাড়া দিলে প্রচন্ড শক্তিশালে টানে আসামী ছিঁড়ে চার টুকরো হয়ে যেত!

এভাবে ব্যর্থ হলে অপরাধীর হাত-পা ভোতা অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করা হত যাতে যন্ত্রণার পরিমান বেশি হয়। এরপর শরীরের পেট কেটে নারিভূড়ী বের করে তার চোখের সামনেই সেগুলো আগুনে ঝলসানো হত অতঃপর মাথাটকে ফাসিতে ঝোলানো হত! আজকের সভ্য ইংল্যান্ডের উদ্ভাবিত মৃত্যুদন্ডের এই দীর্ঘ আর ভয়ংকর পদ্ধতিকে এখনো মৃত্যুর নিষ্ঠুরতম রুপ হিসেবে বিবেচিত করা হয়!

চারটি ঘোড়া দিয়ে টেনে এভাবেই অপরাধীর শরীরকে ছিঁড়ে ফেলা হত – image source: Encyclopedia Britannica

১০) শূলবিদ্ধ করা (Impalement)

এই পদ্ধতিতে অপরাধী বা বন্দিকে বিবস্ত্র করে একটি লম্বা সূক্ষ্ণ-সূঁচালো লোহার দন্ড তার মলদ্বার দিয়ে ঢুকিয়ে বসিয়ে দেয়া হত! এরপর অপেক্ষাকৃত নিচের দিকে মোটা দন্ডটি সোজা উপরের দিকে খাড়া করে দেয়া হত, এরফলে বন্দি তার নিজের দেহের ভারেই আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকত আর দন্ডের সূঁচালো মাথাটা তার গলা বুক অথবা মাথা ফুড়ে বের হয়ে আসত! এরপর মৃতদেহটি ওই অবস্থাতেই জনসম্মুখ্যে ২ থেকে ৩ দিন ঝুলিয়ে রাখা হত! বর্তমান রোমানিয়ার ভ্ল্যাদ-দি-ইম্পেলার (Vlad the Impaler) ১৫তম শতাব্দীর শাসনামলে এই নিষ্ঠুরতম মৃত্যদন্ডাদেশ এর জন্য কুখ্যাত ছিলেন।

শূলে চড়ানো অপরাধী – image source: allthatinteresting.com

৯) বাঁশের ব্যাবহার

বাঁশ হচ্ছে ঘাস জাতীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা উদ্ভিদ। কিছু কিছু জাতের বাঁশ প্রতিদিন ২০-৪০ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হয়। প্রাচীনকালে বাঁশের এই দ্রুত বেড়ে ওঠার ব্যাপারটিই অপরাধীদের নির্যাতন করার কাজে ব্যাবহার করা হত! অপরাধীকে ছোট ছোট কিছু বাঁশ চারার উপর হাত পা বেঁধে শুইয়ে দেয়া হত। দুই থেকে তিনদিনের মধ্যেই ওই বাঁশ গুলো বড় হতে হতে অপরাধীর পেট বুক চিড়ে বের হয়ে যেত। অমানুষিক যন্ত্রনা আর রক্তক্ষরণ হতে হতে অপরাধীর মৃত্যু হত!

এভাবেই বাঁশ অপরাধীর বুক-পেট ফুঁড়ে বের হয়ে যেত – image source: ScoopWhoop

৮) ফুটন্ত পানি

প্রাচীন চিনে এই পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়। পদ্ধতিটি ছিল ধীর এবং তীব্র যন্ত্রণাদায়ক যা হয়তো আমরা আমাদের কল্পনাতেও আনতে চাইবনা। এই পদ্ধতিতে প্রথমে একটি বড় পাত্রে তেল, মোম অথবা পানি গরম করা হত। এরপর বন্দী ব্যাক্তিকে একসাথে না ফেলে একটু একটু করে ওই ফুটতে থাকা পাত্রে ছাড়া হত! এভাবেই বন্দীর পুরো শরীরের মাংস সিদ্ধ অথবা ভাজা হয়ে যেত! চীন এই পাশবিক শাস্তির সূচনা করলেও জাপান, ফিজি এমনকি যুক্তরাজ্যেও ১৫০০ শতক পর্যন্ত এর প্রচলন ছিল। যদিও ইতিহাসের কিছু দলিল এ জাতীয় ভংকর মৃত্যুদন্ড পদ্ধতি অস্বীকার করে।

ফুটন্ত তেল বা পানিতে ফেলা হচ্ছে – image source: eastbourneguide.com

৭) করাত দিয়ে কাটা

ইউরোপ এবং এশিয়ার কিছু অঞ্চলে অপরাধের শাস্তি হিসেবে করাত দিয়ে মানুষ কাটার চর্চা ছিল! এই পদ্ধতিতে বন্দিকে পা উপরের দিকে দিয়ে ঝুলিয়ে বাধা হত। এরপর তার পায়ুপথ থেকে শুরু করে শরীরের মাঝ বরাবর করাত চালানো হত। বেশিরভাগ সময়ই তলপেট পর্যন্ত কেটে রেখে দেয়া হত! উল্টোকরে ঝুলিয়ে রাখার কারনে অধিক সময় ধরে মস্তিষ্কে রক্তের সঞ্চালন থাকত, যার ফলে শরীরের বোধও অনেক্ষন থাকত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অসহ্য যন্ত্রণার অনুভূতি নিতে নিতে অপরাধীকে মরতে হত!

করাতের পদ্ধতিটি – image source: Science Source

৬) ইঁদুরের মরণ খেলা

ইতিহাসের আরেক ভয়াবহ নির্যাতন পদ্ধতির নাম ইঁদুরের খেলা। এই পদ্ধতিতে বালতি আকৃতির একটি পাত্র অথবা একটি খাচার ভিতরে কিছু ক্ষুধার্ত বড় বড় ইঁদুর ভরে দেয়া হত। এরপর খাচার খোলা মুখটি বেঁধে রাখা অপরাধীর পেটে উপুর করে বেঁধে দেয়া হত, যার ফলে পেট আর খাচার মধ্যে বন্দি হয়ে যেত ইঁদুর গুলো। বন্দি ক্ষুধার্ত ইঁদুর গুলো এক সময়ে অস্থির হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিত আর বের হয়ে আসার চেষ্টা করত! এরপর জল্লাদেরা ইঁদুর এর অস্থিরতা আরো বাড়িয়ে দেয়ার জন্য কলড্রেন এর পিছনের দিকে আগুনের দিত, গরমের তাপে ইদুরদের ছটফট আরো বেড়ে যেত। এক পর্যায়ে ক্ষুধা আর গরমের তাপ সহ্য করতে না পেরে ইঁদুর গুলো অপরাধীর নরম পেট আর নাড়িভূড়ী ছিঁড়ে খাওয়া শুরু করত আর সামনের দিক দিয়ে বের হয়ে আসার চেষ্টা করত! এমন ভয়ংকর উপায় কাজে লাগিয়েই একটা সময়ে মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করা হত!

ইঁদুরের ভয়াবহ অত্যাচার – image source: allthatinteresting.com

৫) কলোম্বিয়ান নেক-টাই

কলোম্বিয়ার ১০ বছরের লম্বা গৃহ-যুদ্ধ ‘লা-ভায়োলেন্সিয়া’ (La Violencia) চলাকালিন মানুষের বুকের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেয়ার জন্য ভয়ংকর এক হত্যাকান্ড পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়ে ছিল, যার নাম কলোম্বিয়ান নেক-টাই! প্রথমে ভোঁতা একটি ছুঁড়ি দিয়ে আসামী বা বন্দি ব্যাক্তির গলা কেটে ফাক করা হত, এরপর সেই ফাক দিয়ে জিহ্বা টেনে এনে বাইরের দিকে ঝুলিয়ে দেয়া হত! দেখে মনে হত গলায় টাই ঝুলছে! শ্বাসরোধ আর রক্তক্ষরণে আসামীর মৃত্যু হলে অন্যদের ভয় দেখানো আর সাবধান করার জন্য মৃতদেহটি বাইরে লোক-সম্মুখ্যে ফেলে রাখা হত!

গলার ফাঁক দিয়ে জিহ্বা বের করে এনে টাইয়ের মত ঝুলিয়ে রাখা হত – image source: fatinvee.blogspot.com

৪) লিংচি বা স্লো স্লাইসিং

চিনে উদ্ভাবিত আরেক পাশবিক নির্যাতন এর নাম লিংচি (Lingchi) বা স্লো স্লাইসিং! এই পদ্ধতিতে মৃত্যদন্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিকে জনসম্মুখে অথবা কোন গাছের সাথে বাধা হত। এরপর নিয়োগপ্রাপ্ত জল্লাদ বিশেষ ধারালো একটি ছুড়ি দিয়ে অপরাধীর শরীরের বিভিন্ন ছোট ছোট অংশ যেমন, হাতের আঙ্গুল, পায়ের আঙ্গুল, নাক, কান এগুলো কাটা শুরু করত! এই মৃত্যুদন্ডের উদ্দেশ্যই ছিল আসামীকে দীর্ঘক্ষন বাচিয়ে রেখে ধীরে ধীরে মৃত্যু প্রদান করা! নাক, কান, আঙ্গুল এসব কাটা হয়ে গেলে শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে একটু একটু করে মাংস কেটে নেয়া হত। মাংস কাটা হয়ে গেলে অপরাধীর হৃদপিন্ডে সজোড়ে ছুড়িটি ঢুকিয়ে দেয়া হত, অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে অপরাধীর মৃত্যু হত। চিনে তখন বড় কোন অপরাধের শাস্তি হিসেবে এই নির্যাতন করা হত। স্লো ডেথ নামেও পরিচিত এই পদ্ধতিটি অবশেষে বিংশ শতাব্দীতে এসে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়!

স্লো স্লাইসিং – image source: DICOTD – WordPress.com

৩) ব্র্যাজেন বুল বা ব্রোঞ্জের ষাঁড়

নির্যাতন পদ্ধতির অন্যতম ব্র্যাজেন বুল অথবা ব্রোঞ্জের ষাঁড় ছিল অবিকল ষাঁড়ের মতই দেখতে বিশাল একটি স্ট্রাকচার। ব্রোঞ্জ দিয়ে বানানো নিখুত দাঁড়িয়ে থাকা এই ষাঁড়টির ভিতরের অংশটা হত ফাঁপা যার মধ্যে অনায়াসে একজন মানুষকে ভরে দেয়া যেত! সিসিলির শাসক ফালারিস (Phalaris) এর শাসন আমলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য এই ব্র্যাজেন বুল ব্যাবহারের প্রচলন ছিল।

এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে জোর করে ব্র্যাজেন বুলের পেটের দিকে থাকা দরজা দিয়ে ভিতরে ভরে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়া হত, এরপর বুলের নিচে জ্বালিয়ে দেয়া হত আগুন! সেই ভয়াবহ আগুনের তাপমাত্রা হত প্রায় ৭০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস! সেই প্রচন্ড আগুনের তাপে কিছুক্ষনের মধ্যেই ব্রোঞ্জের তৈরী ষাঁড়টি টকটকে লাল রঙ ধারন করত, আর ভিতরে থাকা অপরাধী চিৎকার করতে করতে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে জ্যান্ত পুড়ে মরত!

ব্র্যাজেন বুলের মুখের সাথে ভিতর থেকে বিশেষ একটা পাইপ লাগানো থাকত, সেই পাইপ দিয়ে অপরাধীর করতে থাকা চিৎকার ষাঁড়ের গর্জনের মত শোনাত আর ব্রোজেন বুলের নাকের ফাকা অংশ দিয়ে মানুষ পোড়া মাংসের গন্ধ বের হয়ে আসত! কথিত আছে শাসক ফালারিস কেও ক্ষমতাচ্যুত এর পর এইভাবে মৃত্যদন্ড দেয়া হয়।

ব্রোঞ্জের তৈরী ষাঁড় – image source: commons.wikimedia.org

২) ব্লাড ইগল

নর্ডিক উপাখ্যান গুলির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম অত্যাচার পদ্ধতি ছিল এই ব্লাড ইগল। এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে বেঁধে পিছন থেকে ছুড়ি দিয়ে কেটে ফেলা হত, এরপর পিছনদিকের পাজরের হাড়গুলোকে টেনে বের করে দুইপাশে ছড়িয়ে দেয়া হত! দেখলে মনে হত ইগলপাখি পাখা মেলে আছে! শরীরের সেই ফাকা অংশ দিয়ে অপরাধীর ভিতরের অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ দেখা যেত! গা শিউড়ে ওঠা এই পদ্ধতির এখানেই শেষ নয়, এরপর খুব সাবধানে অক্ষত অবস্থায় ভিতরের ফুসফুস আর লিভার বের করে আনা হত যাতে অপরাধী আরো কিছুক্ষন যন্ত্রনা নিয়ে বেচে থাকে, যন্ত্রনা আরো বাড়িয়ে দেয়ার জন্য সেখানে লবনও ছিটিয়ে দেয়া হত!

এভাবেই পিছনদিকের পাজরের হাড়গুলোকে টেনে বের করে উড়ন্ত ইগলের মত করে রাখা হত – image source: pinterest.com

১) চামড়া ছাড়ানো বা ফ্ল্যাইং

জীবন্ত মানুষের চামড়া ছাড়ানোর এই পদ্ধতিকে বলা হয় ফ্ল্যাইং! মধ্যযুগের ইউরোপে বিশ্বাস ঘাতকতার জন্য এমন শাস্তি দেয়া হত। জীবন্ত একটা মানুষের চামড়া কেটে তা টেনে টেনে তুলে ফেলা হচ্ছে! ভাবা যায়? যন্ত্রনাদায়ক এই পদ্ধতিতে এইভাবে চামড়া তুলে নিয়ে ভিতরের দেহটি আলাদা করে ফেলে রাখা হত। এভাবে ফেলে রাখার ফলে শরীরের রক্ত সহ অন্যান্য তরল ও ফ্লুইড বেরিয়ে যেত। যন্ত্রণাকে আরো তীব্র করতে কখনো কখনো সে শরীরে লবন মাখানো হত! শেষ পর্যন্ত মৃত্যু আসতে আসতে কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিন সময় লেগে যেত।

জীবন্ত ব্যাক্তির শরীর থেকে চামড়া তুলে নেয়া হচ্ছে – image source: Siódma – Dziewiąta

ইতিহাস ঘাটলে এমন আরো অসংখ্য ভয়াবহ অত্যাচার আর হত্যাকান্ডের বর্ননা পাওয়া যাবে। শত শত বছর এসব নির্মম আর বর্বর হত্যাকান্ডের প্রচলন ছিল আর শত শত মানুষ এসব হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। প্রাচীন আর মধ্যযুগের বেশিরভাগ অত্যাচারী ব্যাক্তি কিংবা শাসকই বিশ্বাস করত মৃত্যু একটি সহজ স্বাভাবিক বিচার! স্বাভাবিক মৃত্যদন্ড দেয়া মানেই আসামী বা বন্দিদের মুক্তি দিয়ে দেয়া। মৃত্যুর ভিতর দিয়ে তাদের আসলে মুক্তি ঘটে, অপরাধ করেও একপ্রকার বেঁচে যায় তারা! তাই পৃথিবীতেই আসামী বা বন্দিদের নরক যন্ত্রণা দেয়ার ব্যবস্থা করা হত। তারা চাইত সরাসরি মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে অপরাধীদের আরো কঠোরতম কোন শাস্তি দেয়া হোক, অসহ্য মৃত্যু যন্ত্রণায় ভুগে ধীরে ধীরে মৃত্যু হোক।

কোন কোন শাসক প্রজাদের ভয় দেখানোর জন্য অথবা নিছক আনন্দ পাবার জন্যও নৃশংস আর ভয়ঙ্কর সব মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন! গা-শিউরে ওঠা সেসব বর্ননা শুনলে অভিশপ্ত সে সকল সমাজ ব্যাবস্থায় জন্মাতে হয়নি বলে নিজেকে সৌভাগ্যবানই মনে হয়!

Featured image source: paintingandframe.com

Share Your Reactions or Comments Below
  • Awesome (4)
  • Interesting (0)
  • Useful (0)
  • Boring (0)
  • Not Good (0)

Last Updated on

আরো দেখুন

Leave a Comment